কালিয়াকৈরে তীব্র গ্যাস সংকট, সিএনজি স্টেশনে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন; অচল অ্যাম্বুলেন্স, চরম ভোগান্তিতে জনজীবন
শাকিল হোসেন, কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তীব্র গ্যাস সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত প্রায় ১০ দিন ধরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় আবাসিক গ্রাহক, সিএনজি চালক, অ্যাম্বুলেন্সচালক ও শিল্পকারখানার শ্রমিক-কর্মচারীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। গ্যাসের আশায় সিএনজি স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন জরুরি সেবায় নিয়োজিত অ্যাম্বুলেন্সচালকরা। গ্যাস না থাকায় রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাতায়াতও ব্যাহত হচ্ছে। কালিয়াকৈর উপজেলা বেসরকারি ক্লিনিক এলাকা থেকে বিভিন্ন সিএনজি স্টেশন পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্স ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
ঢাকায় রোগী নিয়ে যাওয়ার পথে একটি সিএনজি স্টেশনে প্রায় চার ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মাত্র ৩০ টাকার গ্যাস পেয়েছেন অ্যাম্বুলেন্সচালক সেলিম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “রোগীর অবস্থা খারাপ, অক্সিজেন চলছে। কিন্তু ৩০ টাকার গ্যাস দিয়ে পাঁচ কিলোমিটারও যাওয়া যাবে না। রাস্তায় রোগী মারা গেলে এর দায় কে নেবে?”
স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্যাস সংকটের কারণে সময়মতো রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় কয়েকজন রোগী পথে মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবে এসব মৃত্যুর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বুধবার (১৯ আগস্ট) সকাল থেকে কালিয়াকৈর পৌরসভা, সফিপুর, চন্দ্রা ও মৌচাকসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
কালিয়াকৈর বাজারের বাসিন্দা হাসিনা বেগম বলেন, “সকাল ৬টা থেকে চুলা জ্বালানোর চেষ্টা করছি। ১০টার দিকে সামান্য আগুন আসে, এরপর আবার বন্ধ হয়ে যায়। বাচ্চাদের স্কুলের টিফিনও বানাতে পারিনি। বাধ্য হয়ে ২ হাজার ১০০ টাকায় এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, গ্যাস সংকটের সুযোগে এলপিজি ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। আগে যে সিলিন্ডার প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকায় পাওয়া যেত, সেটিই এখন ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, কালিয়াকৈর উপজেলার ২৩টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে প্রায় ১৫টি গ্যাসের অভাবে বন্ধ রয়েছে। চালু থাকা কয়েকটি স্টেশনেও গ্যাস সরবরাহ খুবই কম। ফলে সিএনজি চালকদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
একটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল ৮টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা চালকরা দুপুর ২টার দিকে মাত্র ৩০ থেকে ৭০ টাকার গ্যাস পাচ্ছেন। এতে কয়েক কিলোমিটার চলার পরই আবার গ্যাসের প্রয়োজন হচ্ছে।
সিএনজি চালক রফিক মিয়া বলেন, “সকাল ৮টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। দুপুর ২টায় ৭০ টাকার গ্যাস পেলাম। এই গ্যাস দিয়ে গাড়ি চালিয়ে পেটের ভাত জোগাড় করব কীভাবে? মালিকের জমা দেব কীভাবে? এভাবে চলতে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে।”
গ্যাস সংকটের কারণে সড়কে যানবাহনের সংখ্যাও কমে গেছে। ফলে বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। অন্যদিকে কালিয়াকৈর শিল্পাঞ্চলের কয়েকটি গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কারখানায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘায়িত হলে রপ্তানি আদেশ বাতিলের পাশাপাশি শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিডিসিএল) কালিয়াকৈর জোনাল অফিসের ব্যবস্থাপক জানান, জাতীয় গ্রিডে এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। চাহিদার তুলনায় তারা বর্তমানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ গ্যাস পাচ্ছেন। এ কারণে আবাসিক ও যানবাহন খাতে গ্যাসের চাপ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।
গ্যাস সংকটে ক্ষুব্ধ কালিয়াকৈরবাসী দ্রুত এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক করে আবাসিক, যানবাহন ও শিল্প খাতে গ্যাসের চাপ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এ সংকট চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
তারিখ: ১৯-০৮-২০২৬ ইং


কোন মন্তব্য নেই: