বাংলা মায়ের শরৎবেশী রুপ


 বাংলা মায়ের শরৎবেশী রুপ


তাকওয়া রহমান 


পাল উড়িয়ে দে রে মাঝি,

পাল উড়িয়ে দে।

দেখতে যাবো বাংলা মায়ের,

শরৎবেশী রুপ।


শরৎ এলে আকাশের যে গভীর নীলিমা, 

মেঘেরা সাদা পালকের মতো ভেসে বেড়ায়—

মনে হয়, নৈঃশব্দ্যেরও বুঝি নিজস্ব কোনো ভাষা আছে,

যে ভাষায় প্রকৃতি অনুভূতির কথাই কবির কানে বলে যায়।

শিউলির স্নিগ্ধ সুবাসে ভোর নামে,

ঘাসের ডগায় জমে থাকে শিশিরের স্বচ্ছ অশ্রুবিন্দু;

কাশবনের শুভ্র দোলায়

কোনো এক অদৃশ্য বেদনা বারবার ফিরে আসে—

যেন হারিয়ে যাওয়া কোনো প্রিয় মুখ

স্মৃতির অলিন্দে দাঁড়িয়ে আজও নিঃশব্দে ডাকে।


শরতের রৌদ্রও কেমন মায়াবী—

তীব্র নয়, অথচ হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশে গিয়ে স্পর্শ করে;

তার কোমল আলোয় পুরোনো অভিমানগুলো

ধীরে ধীরে গলে যায়,

আর মন, দীর্ঘ নৈঃসঙ্গ্যের পর,

অকারণেই হয়ে ওঠে বিষণ্ণ সুন্দর।

এই ঋতুতে নদীর জলেও যেন অন্যরকম বিষাদ,

দূর দিগন্তে কাশফুলের সারি—

যেন শুভ্র কোনো স্বপ্নের শেষ প্রান্তে

অপেক্ষমাণ এক অনামিকা সন্ধ্যা।


বাতাসে ভেসে আসে শিউলির গন্ধ,

আর বুকের ভেতর হঠাৎ করেই

জেগে ওঠে বহুদিনের বিস্মৃত কোনো অনুভব।

শরৎ বড় অদ্ভুত—

সে আনন্দের মাঝেও বিষণ্ণতা রেখে যায়,

প্রাপ্তির ভেতরেও শূন্যতার ইশারা দেয়।

তাই হয়তো শরতের আকাশের দিকে তাকালে

মন ভালো হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি

কাউকে হারানোর মতো এক অজ্ঞাত হাহাকারও জেগে ওঠে।


মনে হয়,

জীবনে কিছু মানুষ শরতের মেঘের মতো—

হঠাৎ আসে, আকাশজুড়ে মায়া ছড়ায়,

তারপর কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই

দূর দিগন্তের ওপারে মিলিয়ে যায়।

তবু তাদের রেখে যাওয়া আবেশ

শিউলির সুবাসের মতো

অনেকদিন নীরবে লেগে থাকে হৃদয়ের ভাঁজে।


হে শরৎ,

তুমি কি তবে কেবল ঋতু?

নাকি তুমি কোনো সুদূর অতীতের

অমলিন স্মৃতির নাম—

যেখানে নীল আকাশের নিচে

কেউ একজন আজও অপেক্ষা করে,

কেউ একজন আজও ফিরে তাকায়,

আর কেউ একজন নিঃশব্দে ভালোবেসে যায়

ফিরে না-আসা কোনো ঋতুর মতো?

তোমার কাশবনে যে বাতাস দোলে,

তার সঙ্গে আমার কত না-জানা কথা ভেসে যায়;

তোমার শিউলি-ঝরা প্রভাতে

আমি খুঁজে ফিরি হারানো দিনগুলোর গন্ধ।


আর সন্ধ্যা নামলে মনে হয়—

এই যে এত সৌন্দর্য চারদিকে,

তারও গভীরে কোথাও

একটি নিঃসঙ্গ হৃদয় বসে আছে,

যে শরৎবেশী হয়ে নিজের কাছেই ফিরে আসে।


তাই শরৎ আমার কাছে

শুধু শুভ্র কাশফুল, নীল আকাশ কিংবা শিউলির সুবাস নয়—

শরৎ হলো হৃদয়ের গোপনতম কুঠুরিতে

সযত্নে লুকিয়ে রাখা এক দীর্ঘশ্বাস;

এক মায়াময় বিষণ্ণতা,

যাকে ভুলতে ইচ্ছে করে না,

যাকে ছুঁতে গেলে ব্যথা লাগে,

তবু যার সৌন্দর্য থেকে

চোখ ফেরানো বড় দায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ