কালিয়াকৈরে তীব্র গ্যাস সংকটে পোশাক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত, বেকার হওয়ার শঙ্কায় হাজারো শ্রমিক


 

শাকিল হোসেন
কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি

তারিখ: ২১ আগস্ট ২০২৬

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তীব্র গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় উপজেলার নিশ্চিন্তপুর, সফিপুর, মৌচাক ও কালিয়াকৈর সদর এলাকার গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এতে কারখানা মালিকরা প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের লোকসান গুনছেন, পাশাপাশি হাজারো শ্রমিকের চাকরি নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, এলএনজি টার্মিনাল দুর্ঘটনার পর প্রায় এক মাস ধরে গ্যাস সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেক কারখানা স্বাভাবিক উৎপাদন চালাতে পারছে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে কোথাও কোথাও ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করা হলেও এতে উৎপাদন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, কালিয়াকৈরের নিশ্চিন্তপুর এলাকার লিবাস টেক্সটাইল, নরু গ্রুপসহ বিভিন্ন বড় কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ব্যাপকভাবে কমে গেছে। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে। গ্যাসের চাপ না থাকায় সুতা, ডাইং ও ফিনিশিংসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক সেকশনের মেশিন বন্ধ রয়েছে। ফলে কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্যও কমে গেছে।

শ্রমিকদের মনোবল ধরে রাখতে সম্প্রতি কয়েকটি কারখানায় মালিকপক্ষ শ্রমিকদের সঙ্গে এক কাতারে বসে দুপুরের খাবারের আয়োজন করেছে। তবে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় চাকরি হারানোর আতঙ্ক কাটছে না শ্রমিকদের মধ্যে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অপারেটর বলেন, “গ্যাস নেই, কাজ নেই। এভাবে চলতে থাকলে মালিক বেতন দেবেন কীভাবে? আমাদের সংসার চলবে কীভাবে—সেটাই এখন চিন্তার বিষয়।”

কারখানা মালিকরা জানান, গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ডিজেল জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এতে উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। কালিয়াকৈরের একটি মাঝারি কারখানার মালিক বলেন, স্বাভাবিক সময়ে কারখানায় মাসে ৩-৪ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হতো। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হচ্ছে। গত তিন মাসে শুধু জ্বালানি খাতেই ৫ কোটির বেশি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, “এভাবে লোকসান দিয়ে আর কতদিন কারখানা চালানো সম্ভব, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে অনেক কারখানা উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে।”

সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে তৈরি পোশাক ও ডাইং শিল্প। শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাগুলোতে কাপড় ডাইং ও ফিনিশিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত গ্যাসের প্রয়োজন হয়। কিন্তু গ্যাসের চাপ না থাকায় ডাইং ইউনিটের উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়েছে। এতে প্রক্রিয়াজাত কয়েক টন ভেজা কাপড় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কারখানা মালিকদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘায়িত হলে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। এতে বিদেশি ক্রেতারা (বায়ার) ক্রয়াদেশ বাতিল করতে পারেন। ফলে একদিকে রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে হাজারো শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ বিষয়ে তিতাস গ্যাসের গাজীপুর শাখার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “আমরা যতটুকু গ্যাস পাচ্ছি, তা দিয়ে পরিস্থিতি ম্যানেজ করার চেষ্টা করছি। তবে বর্তমানে যে পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, তা চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য।”

গাজীপুর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, গ্যাস সংকটের কারণে কালিয়াকৈরের শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক কারখানা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে কতটি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি শিল্পকারখানার জন্য পৃথক গ্যাসলাইন স্থাপন এবং জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।

কালিয়াকৈর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক কারখানা গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত করার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি। বিশেষ করে নিশ্চিন্তপুর ও সফিপুর এলাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। ডিজেলের বাড়তি খরচে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন মালিকরা। অন্যদিকে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হাজারো শ্রমিক।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, শিল্পকারখানাগুলো সচল রাখা এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা না হলে কালিয়াকৈরের শিল্প খাত ও স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ